যৌবনের গান- কাজী নজরুল ইসলাম

যৌবনের গান
কাজী নজরুল ইসলাম

 

আমার বলিতে  দ্বিধা নাই যে, আমি আজ তাঁহাদেরই দলে, যাঁহারা কর্মী নন ধ্যানী (ধ্যানীরা পরিকল্পনা করে, কর্মীরা তা বাস্তবায়ন করে)। যাঁহারা মানব জাতির কল্যাণ সাধন করেন (বুদ্ধিবৃত্তিক) সেবা দিয়া, কর্ম দিয়া, তাঁহারা মহৎ যদি না-ই হন, অন্তত ক্ষুদ্র নন (ধ্যানীদের অবদান মোটেও ফেলনা নয়)। ইহারা থাকেন শক্তির পেছনে রুধির ধারা (রক্ত প্রবাহ) মতো গোপন, ফুলের মাঝে মাটির মমতা-রসের মতো অলক্ষ্যে (ধ্যানীরা বুদ্ধি দিয়ে কর্মীদের পরিচালনা করেন)।

আমি কবি-বনের পাখির মতো স্বভাব আমার গান করার। কাহারও ভালো লাগিলেও গাই, ভালো না লাগিলেও গাহিয়া যাই (স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য)। বায়স (কাক) ফিঙে যখন বেচারা গানের পাখিকে (কোকিল) তাড়া করে, তীক্ষ্ণ চঞ্চু (ধারালো ঠোঁট) দ্বারা আঘাত করে, তখনও সে এক গাছ হইতে উড়িয়া আন গাছে গিয়া গান ধরে (শত প্রতবিন্ধকতার পরও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য কেউ ভুলতে পারে না)। তাহার হাসিতে গান, তাহার কান্নায় গান। সে গান করে আপন মনের আনন্দে (কোনো প্রাপ্তি বা ফলের আশায় নয়)-যদি তাহাতে কাহারও অলস-তন্দ্রা, মোহ-নিন্দ্রা (জড়তা) টুটিয়া যায় (ইতিবাচক পরিবর্তন আসে), তাহার একান্ত দৈব (কবির কৃতিত্ব নয়)। যৌবনের সীমা পরিক্রমণ আজও আমার শেষ হয় নাই (লেখক যৌবনকে ধারণ করে)। কাজেই আমি যে গান গাই, তাহা যৌবনের গান। তারুণ্যের ভরা-ভাদরে (পরিপূর্ণ সময়ে) যদি আমরা গান জোয়ার আনিয়া থাকে (তরুণদের অনুপ্রেরণা জোগায়), তাহা আমার অগোচরে; যে চাঁদ সাগরে জোয়ার জাগায়, সে হয়তো তাহার শক্তি সম্বন্ধে আজও না-ওয়াকিফ (অনবগত)। (অনেক শক্তিই জানে না- তার সামর্থ্য বা প্রভাব কতটুকু)

 

আমি বক্তাও নহি (বেশি কথা বলার পক্ষপাতী নই)। আমি কমবক্তার দলে। বক্তৃতায় যাঁহারা দিগ্বিজয়ী, বক্তিয়ার খিলজি (ব্যঙ্গ প্রকাশ), তাঁহাদের বাক্যের সৈন্য সামন্ত অত দ্রুতবেগে কোথা হইতে কেমন করিয়া আসে বলিতে পারি না (তাদের বিরামহীন অতি কথন দেখে কবি অবাক হয়)। তাহা দেখিয়া লক্ষ্মণ সেন আপেক্ষা আমরা বেশি অভিভূত হইয়া পড়ি। তাঁহাদের বাণী আসে বৃষ্টিধারায় মতো অবিরল ধারায়। আমাদের কবিদের বাণী বহে ক্ষীণ ভীরু ঝরনাধারার মতো। ছন্দের দুকূল (ভাব ও ভাষা) প্রাণপণে আঁকড়িয়া ধরিয়া সে সঙ্গীত গুঞ্জন করিতে করিতে বহিয়া যায়। পদ্মা ভাগীরথীর মতো খরস্রোতা যাঁহাদের বাণী (বক্তাদের বাণী), আমি তাঁহাদের বহু পশ্চাতে (অতি কথনে কবি অভ্যস্ত নয়)।

আমার একমাত্র সম্বল-আপনাদের তরুণদের প্রতি আমার অপরিসীম ভালোবাসা, প্রাণের টান। তারুণ্যকে, যৌবনকে, আমি যেদিন হইতে গান গাহিতে শিখিয়াছি, সেদিন হইতে বারে বারে সালাম করিয়াছি, সশ্রদ্ধ নমস্কার নিবেদন করিয়াছি (যুবক হওয়ার পর থেকেই কবি যৌবনকে শ্রদ্ধা করে আসছেন), জবাকুসুমসঙ্ককাশ তরুণ অরুণকে দেখিয়া (জবাফুলের মতো উজ্জ্বল সূর্য) প্রথম মানব যেমন করিয়া সশ্রদ্ধ নমস্কার করিয়াছিলেন, আমার প্রথম জাগরণ প্রভাবে তেমন সশ্রদ্ধ বিস্ময় লইয়া যৌবনকে অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়াছি, তাহার স্তবগান গায়িহাছি। তরুণ অরুণের মতোই যে তারুণ্য তিমিরি বিদারী (মনের অন্ধকার দূর করে), সে যে আলোর দেবতা (সূর্য)। রঙের খেলা খেলিতে খেলিতে তাহার উদয়, রং ছড়াইতে ছড়াইতে তাহার অস্ত। যৌবন সূর্য যেথায় অস্তমিত, দুঃখের তিমির কুন্তলা নিশীথিনীর সেই তো লীলভূমি। (মনের যৌবনের সমাপ্তি মানেই বার্ধক্যের দুঃখ শুরু)

আমি যৌবনের পূজারী কবি বলিয়াই যদি আমায় আপনারা আপনাদের মালার মধ্যমণি করিয়া থাকেন, তাহা হইলে আমার অভিযোগ করিবার কিছুই নাই। আপনাদের মহাদান আমি সানন্দে শির নত করিয়া গ্রহণ করিলাম। আপনাদের দলপতি হইয়া নয়, আপনাদের দলভুক্ত হইয়া, সহযাত্রী হইয়া। আমাদের দলে কেহ দলপতি নাই (আমরা সবাই রাজা), আজ আমরা শত দিক হইতে শত শত তরুণ মিলিয়ে তারুণ্যের শতদল ফুটাইয়া তুলিয়াছি (তারুণ্যের পদ্মফুল)। আমার সকলে মিলিয়া এক সিদ্ধি (আমাদের সকলের একটাই সাধনা তা হচ্ছে তারুণ্য), এক ধ্যানের মৃণাল (পদ্মের ডাঁট) ধরিয়া বিকশিত হইতে চাই।

বার্ধক্য তাহাই-যাহা পুরাতনকে, মিথ্যাকে, মৃত্যুকে আঁকড়িয়া পড়িয়া থাকে, (পুরোনো সংস্কার ধরে রাখতে চায় বা পরিবর্তনে বিশ্বাসী না) বৃদ্ধ তাহারাই-যাহারা মায়াচ্ছন্ন নব মানবের অভিনব জয় যাত্রার শুধু বোঝা নয়, বিঘ্ন (সমর্থন তো করেই না, বরং প্রতিবন্ধতা তৈরি করে); শতাব্দীর নব যাত্রীর চলার ছন্দে ছন্দ মিলাইয়া যাহারা কুচকাওয়াজ করিতে জানে না, পারে না (সময়ের সাথে চলতে পারে না); যাহারা জীব হইয়াও জড়; যাহারা অটল সংস্কারের পাষাণস্তুপ আঁকড়িয়া পড়িয়া আছে (কুসংস্কারকে বুকে চেপে ধরে রাখে)।
বৃদ্ধ তাহারাই যাহারা নব অরুণোদয় দেখিয়া নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে দ্বার রুদ্ধ করিয়া পড়িয়া থাকে। আলোক পিয়াসী প্রাণচঞ্চল শিশুদের কল কোলাহলে যাহারা বিরক্ত হইয়া অভিসম্পাত করিতে থাকে। জীর্ণ পুঁথি চাপা পড়িয়া যাহাদের নাভিশ্বাস বহিতেছে (অতি বিদ্যার কারণে যাদের মানুষের সাথে মিশে শ্বাস নিতে পারে না), অতি জ্ঞানের অগ্নিমান্দ্যে (বদহজমে) যাহারা আজ কঙ্কালসার বৃদ্ধ তাহরাই। ইহাদের ধর্মই বার্ধক্য। বার্ধক্যকে সব সময় বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না। (বয়সের বিবেচনা যৌবন-বার্ধক্য নির্ণীত হয় না, বরং কর্মই এই দুইয়ের সংজ্ঞা)

বহু যুবককে দেখিয়াছি যাহাদের যৌবনের উর্দির নিচে বার্ধক্যের কঙ্কাল মূর্তি। আবার বহু বৃদ্ধকে দেখিয়াছি- যাঁহাদের বার্ধক্যের জীর্ণাবরণের তলে মেঘলুপ্ত সূর্যের মতো প্রদীপ্ত যৌবন। তরুণ নামের জয়-মুকুট শুধু তাহারই যাহার শক্তি অপরিমাণ, গতিবেগ ঝঞ্ঝার ন্যায়, তেজ নির্মেঘ আষাঢ় মধ্যাহ্নের মার্তন্ডপ্রায়, বিপুল যাহার আশা, ক্লান্তিহীন যাহার উৎসাহ, বিরাট যাহার ঔদার্য (বড় মানসিকতার পরিচয়), অফুরন্ত যাহার প্রাণ, অটল যাহার সাধনা, মৃত্যু যাহার মুঠিতলে (মৃত্যুকে যার ভয় নেই)।

তারুণ্য দেখিয়াছি আরবের বেদুইনদের মাঝে, তারুণ্য দেখিয়াছি মহাসমরের সৈনিকের মুখে, কালাপাহাড়ের অসিতে, কামাল-করিম-মুসোলিনি-সানইয়াৎ লেনিনের শক্তিতে।
যৌবন দেখিয়াছি তাহাদের মাঝে- যাহারা বৈমানিকরূপে অনন্ত আকাশের সীমা খুঁজিতে গিয়া প্রাণ হারায়, আবিষ্কারকরূপে নব-পৃথিবীর সন্ধানে গিয়া আর ফিরে না, গৌরীশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার শীর্ষদেশ (হিমালয় জয় করতে গিয়ে) অধিকার করিতে গিয়া যাহারা তুষার-ঢাকা পড়ে, অতল সমুদ্রের নীল মঞ্জুষার মণি আহরণ করিতে গিয়া সলিল সমাধি লাভ করে, মঙ্গলগ্রহে, চন্দ্রলোকে যাইবার পথ আবিষ্কার করিতে গিয়া নিরুদ্দেশ হইয়া যায়পবন-গতিকে পশ্চাতে ফেলিয়া যাহারা উড়িয়া যাইতে চায়, নব নব গ্রহ-নক্ষত্রের সন্ধান করিতে করিতে যাহাদের নয়ন-মণি নিভিয়া যায়- যৌবন দেখিয়াছি সেই দুরন্তদের মাঝে। যৌবনের মাতৃরূপ (সেবাপরায়ণ দিক) দেখিয়াছি- শব বহন করিয়া যখন সে যায় শ্মশানঘাটে, গোরস্থানে, অনাহারে থাকিয়া যখন সে অন্ন পরিবেশন করে দুর্ভিক্ষ বন্যা-পীড়িতদের মুখে, বন্ধুহীন রোগীর শয্যাপার্শ্বে যখন সে রাত্রির পর রাত্রি জাগিয়া পরিচর্যা করে, যখন সে পথে পথে গান গাহিয়া ভিখারী সাজিয়া দুর্দশাগ্রস্তদের জন্য ভিক্ষা করে, যখন দুর্বলের পাশে বল হইয়া দাঁড়ায়, হতাশের বুকে আশা জাগায়।

 

ইহাই যৌবন, এই ধর্ম যাহাদের তাহারাই তরুণ। তাহাদের দেশ নাই, জাতি নাই, অন্য ধর্ম নাই (দেশ-জাতিতে যারা সীমাবদ্ধ না)। দেশ-কাল-জাতি-ধর্মের সীমার ঊর্ধ্বে ইহাদের সেনানিবাস। আজ আমরা- মুসলিম তরুণেরা- যেন অকুণ্ঠিত চিত্তে মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি- ধর্ম আমাদের ইসলাম, কিন্তু প্রাণের ধর্ম আমাদের তারুণ্য, যৌবন (আমাদের অনুপ্রেরণা তারুণ্য)। আমরা সকল দেশের, সকল জাতির, সকল ধর্মের, সকল কালের (বিশ্ব মানবতার)। আমরা মুরিদ যৌবনের। এই জাতি-ধর্ম-কালকে অতিক্রম করিতে পারিয়াছে যাঁহাদের যৌবন (সংকীর্ণ কার্যপরিধিতে সীমাবদ্ধ না), তাঁহারাই আজ মহামানব, মহাত্মা, মহাবীর। তাহাদিগকে সকল দেশের সকল ধর্মের সকল লোক সমান শ্রদ্ধা করে।

পথ-পার্শ্বের ধর্ম-অট্টালিকা আজ পড় পড় হইয়াছে, তাহাকে ভাঙিয়া ফেলিয়া দেওয়াই আমাদের ধর্ম, ঐ জীর্ণ অট্টালিকা চাপা পড়িয়া বহু মানবের মৃত্যুর কারণ হইতে পারে (ধর্মের অপব্যবহার মানব জাতির অকল্যাণ বয়ে আনতে পারে)। যে-ঘর আমাদের আশ্রয় দান করিয়াছে, তাহা যদি সংস্কারাতীত হইয়া আমাদেরই মাথায় পড়িবার উপক্রম করে, তাহাকে ভাঙিয়া নতুন করিয়া গড়িবার দুঃসাহস আছে একা তরুণেরই (ধর্মের অপব্যবহার রোধ)। খোদার দেওয়া এই পৃথিবীর নিয়ামত হইতে যে নিজেকে বঞ্চিত রাখিল, সে যত মোনাজাতই করুক, খোদা তাহা কবুল করিবেন না। খোদা হাত দিয়াছেন বেহেশত ও বেহেশতি চিজ অর্জন করিয়া লইবার জন্য, ভিখারীর মতো হাত তুলিয়া ভিক্ষা করিবার জন্য নয়। আমাদের পৃথিবী আমরা আমাদের মনের মতো করিয়া গড়িয়া লইব। ইহাই হউক তরুণের সাধনা।

Similar Posts

Leave a Reply