জীবন ও বৃক্ষ

জীবন ও বৃক্ষ

মোতাহের হোসেন চৌধুরী

সমাজের (রাষ্ট্রের) কাজ কেবল টিকে থাকার সুবিধা দেওয়া নয় (বেচে থাকাটাই সার্থকতা নয়), মানুষকে (মানসিকভাবে) বড় করে তোলা, বিকশিত (সমৃদ্ধ) জীবনের জন্য মানুষের জীবনে আগ্রহ জাগিয়ে দেওয়া (মানুষের মধ্যে অনুপ্রেরণা জাগানো)। স্বল্পপ্রাণ (সংবেদনশীল) স্থূলবুদ্ধি (অদূরদর্শী) ও জবরদস্তিপ্রিয় (বিচার বিবেচনাহীন) মানুষে সংসার (সমাজ) পরিপূর্ণ। তাদের কাজ নিজের জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে তোলা নয়, অপরের সার্থকতার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা (অপরের উন্নতিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা)। প্রেম ও সৌন্দর্যের (মানবিক প্রেমের অভাবে) স্পর্শ লাভ করেনি বলে এরা নিষ্ঠুর ও বিকৃতবুদ্ধি (যথাযথ চিন্তাচেতনাহীন)। এদের একমাত্র দেবতা অহংকার। তারই চরণে তারা নিবেদিতপ্রাণ। ব্যক্তিগত অহংকার, পারিবারিক অহংকার, জাতিগত অহংকার- এ সবের নিশান ওড়ানোই এদের কাজ (অহংকারের মাধ্যমে বিভেদ সৃষ্টিই করাই তাদের কাজ)। মাঝে মাঝে মানবপ্রেমের কথাও তারা বলে (লৌকিকতা)। কিন্তু তাতে নেশা ধরে না, মনে হয় আন্তরিকতাশূন্য, উপলব্ধিহীন বুলি ।

এদের স্থানে এনে দিতে হবে বড় মানুষ— সূক্ষ্মবুদ্ধি (বিচক্ষণ) উদারহৃদয় (বড় মনের অধিকারী) গভীরচিত্ত (গভীর চেতনার অধিকারী) ব্যক্তি, যাদের কাছে বড় হয়ে উঠবে জীবনের বিকাশ (সমৃদ্ধ জীবনের প্রত্যাশা), কেবল টিকে থাকা নয় (মানবেতর জীবন যাপন নয়)। তাদের কাছে জীবনাদর্শের প্রতীক হবে প্রাণহীন ছাঁচ বা কল নয় (লক্ষ্যহীন জীবন নয়), সজীব বৃক্ষ— যার বৃদ্ধি আছে, গতি আছে, বিকাশ আছে, ফুলে ফলে পরিপূর্ণ হয়ে অপরের সেবার জন্য প্রস্তুত হওয়া যার কাজ (অপরের সেবা করাই বৃক্ষের কাজ)। বৃক্ষের জীবনের গতি ও বিকাশকে উপলব্ধি করা দরকার (বৃক্ষকে উপলব্ধি করে মানুষের জীবন সার্থক করা), নইলে সার্থকতা ও পরিপূর্ণতার ছবি চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হবে না।

বৃক্ষের দিকে তাকালে জীবনের তাৎপর্য উপলব্ধি সহজ হয়। তাই, বারবার সেদিকে তাকানো প্রয়োজন (শিক্ষা নেওয়ার জন্য)। মাটির রস টেনে নিয়ে নিজেকে মোটাসোটা করে তোলাতেই বৃক্ষের কাজের সমাপ্তি নয় (আত্মকেন্দ্রিক কাজেই বৃক্ষ সীমাবদ্ধ থাকে না)। তাকে ফুল ফোটাতে হয়, ফল ধরাতে হয়। নইলে তার জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে (অপরের জন্য কাজ করতে না পারায়)। তাই বৃক্ষকে সার্থকতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা সজীবতা ও সার্থকতার এমন জীবন্ত দৃষ্টান্ত আর নেই (বৃক্ষ থেকে মানুষ নিজের জন্য সার্থক ও অপরের জন্য পরিপূর্ণ হতে পারে)।

অবশ্য রবীন্দ্রনাথ অন্য কথা বলেছেন। ফুলের ফোটা আর নদীর গতির সঙ্গে তুলনা করে তিনি নদীর গতির মধ্যেই মনুষ্যত্বের সাদৃশ্য দেখতে পেয়েছেন। তাঁর মনে মনুষ্যত্বের বেদনা নদীর গতিতেই উপলব্ধ হয়, ফুলের ফোটায় নয় । ফুলের ফোটা সহজ, নদীর গতি সহজ নয়— তাকে অনেক বাধা ডিঙানোর দুঃখ পেতে হয় (মানুষের জীবন ফুল ফোটার মতো সহজ নয়, শত প্রতিবন্ধকতা পার হতে হয়)। কিন্তু ফুলের ফোটার দিকে না তাকিয়ে বৃক্ষের ফুল ফোটানোর দিকে তাকালে বোধ হয় রবীন্দ্রনাথ ভালো করতেন (ফুল নয়, ফুল ফোটাতে বৃক্ষের ত্যাগকে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে)। তপোবনপ্রেমিক (প্রকৃতি প্রেমিক) রবীন্দ্রনাথ কেন যে তা করলেন না বোঝা মুশকিল।

জানি, বলা হবে : (বাহ্যিক দৃষ্টিতে) নদীর গতিতে মনুষ্যত্বের দুঃখ যতটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৃক্ষের ফুল ফোটানোয় তা তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। তাই কবি নদীকেই মনুষ্যত্বের প্রতীক করতে চেয়েছেন।
উত্তরে বলব : চর্মচক্ষুকে বড় না করে কল্পনা ও অনুভূতির চক্ষুকে (অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা) বড় করে তুললে বৃক্ষের বেদনাও সহজে উপলব্ধি করা যায়। আর বৃক্ষের সাধনায় যেমন একটা ধীরস্থির ভাব দেখতে পাওয়া যায়, মানুষের সাধনায়ও তেমনি একটা ধীরস্থির ভাব দেখতে পাওয়া যায়, আর এটাই হওয়া উচিত নয় কি (স্থিরতাই সাধনার সাফল্য)? অনবরত ধেয়ে চলা মানুষের সাধনা হওয়া উচিত নয় (অস্থিরতার মাধ্যমে সাধনা অর্জন করা যায় না)। যাকে বলা হয় গোপন ও নীরব সাধনা তা বৃক্ষেই অভিব্যক্ত, নদীতে নয় । তাছাড়া বৃক্ষের সার্থকতার ছবি যত সহজে উপলব্ধি করতে পারি, নদীর সার্থকতার ছবি তত সহজে উপলব্ধি করা যায় না (সার্থকতা ছাড়া সাধনা মূল্যহীন)। নদী সাগরে পতিত হয় সত্য, কিন্তু তার ছবি আমরা প্রত্যহ দেখতে পাই না। বৃক্ষের ফুল ফোটানো ও ফল ধরানোর ছবি কিন্তু প্রত্যহ চোখে পড়ে। দোরের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে সে অনবরত নতি (বিনয়), শান্তি ও সেবার বাণী প্রচার করে (বৃক্ষের বার্তা)।

সাধনার ব্যাপারে প্রাপ্তি একটা বড় জিনিস (অনুপ্রেরণার জন্য)। নদীর সাগরে পতিত হওয়ায় সেই প্রাপ্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। সে তো প্রাপ্তি নয়, আত্মবিসর্জন (প্রাপ্তি ছাড়া আত্মবিসর্জন সাফল্য নয়)। অপরপক্ষে বৃক্ষের প্রাপ্তি চোখের সামনে ছবি হয়ে ফুটে ওঠে। ফুলে ফলে যখন সে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে তখন আপনা থেকেই বলতে ইচ্ছা হয় : এই তো সাধনার সার্থকতা। বৃক্ষে প্রাপ্তি ও দান (নিজের জন্য প্রাপ্তি ও অপরের জন্য দান)। সৃজনশীল মানুষেরও প্রাপ্তি ও দানে পার্থক্য দেখা যায় না। যা তার প্রাপ্তি তা-ই তার দান ।
বৃক্ষের পানে তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই অন্তরের সৃষ্টিধর্ম উপলব্ধি করেছেন। বহু কবিতায় তার পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু গদ্যে তিনি তা স্পষ্ট করে বলেননি। বললে ভালো হতো। তাহলে নিজের ঘরের কাছেই যে সার্থকতার প্রতীক রয়েছে, সে সম্বন্ধে আমরা সচেতন হতে পারতাম।

নীরব ভাষায় বৃক্ষ আমাদের সার্থকতার গান গেয়ে শোনায়। অনুভূতির কান দিয়ে সে গান শুনতে হবে। তাহলে বুঝতে পারা যাবে জীবনের মানে বৃদ্ধি (আত্মিক বৃদ্ধি), ধর্মের মানেও তাই। প্রকৃতির যে ধর্ম মানুষের সে ধর্ম; পার্থক্য কেবল তরুলতা ও জীবজন্তুর বৃদ্ধির ওপর তাদের নিজেদের কোনো হাত নেই, মানুষের বৃদ্ধির ওপরে তার নিজের হাত রয়েছে (ভালো-মন্দ পরিমাপের মাপকাঠি মানুষের জানা আছে)। আর এখানেই মানুষের মর্যাদা। মানুষের বৃদ্ধি কেবল দৈহিক নয়, আত্মিকও। মানুষকে আত্মা সৃষ্টি করে নিতে হয় (আত্মশুদ্ধি অর্জন করে নিতে হয়), তা তৈরি পাওয়া যায় না। সুখ-দুঃখ-বেদনা উপলব্ধির ফলে অন্তরের যে পরিপক্বতা, তাই তো আত্মা। এই আত্মারূপ (আত্মশুদ্ধির অর্জন) ফল স্রষ্টার উপভোগ্য । তাই মহাকবির (শেক্সপিয়র) মুখে শুনতে পাওয়া যায় : ‘Ripeness is all’- পরিপক্বতাই সব (পরিপূর্ণ বিকাশসাধন)।

আত্মাকে মধুর ও পুষ্ট করে গড়ে তুলতে হবে। নইলে তা স্রষ্টার উপভোগের উপযুক্ত হবে না। বিচিত্র অভিজ্ঞতা, প্রচুর প্রেম ও গভীর অনুভূতির দ্বারা আত্মার পরিপুষ্টি ও মাধুর্য সম্পাদন সম্ভব। তাই তাদের সাধনাই মানুষের শিক্ষার প্রধান বিষয়বস্তু (সাহিত্যের গুরুত্ব)। বস্তুজিজ্ঞাসা তথা বিজ্ঞান কখনো শিক্ষার প্রধান বিষয়বস্তু হতে পারে না (বিজ্ঞান বস্তু নিয়ে কাজ করে, মানুষের আত্মা-মন নিয়ে নয়)। কেননা, তাতে আত্মার উন্নতি হয় না- জীবনবোধ ও মূল্যবোধে অন্তর পরিপূর্ণ হয় না; তা হয় সাহিত্য-শিল্পকলার দ্বারা। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের এত মূল্য।

ওপরে যে বৃদ্ধির কথা বলা হলো বৃক্ষের জীবন তার চমৎকার নিদর্শন। বৃক্ষের অঙ্কুরিত হওয়া থেকে ফলবান হওয়া পর্যন্ত সেখানে কেবলই বৃদ্ধির ইতিহাস। বৃক্ষের পানে তাকিয়ে আমরা লাভবান হতে পারি— জীবনের গূঢ় অর্থ (প্রচ্ছন্ন গভীর তাৎপর্য) সম্বন্ধে সচেতন হতে পারি বলে।
বৃক্ষ যে কেবল বৃদ্ধির ইশারা তা নয়- প্রশান্তিরও ইঙ্গিত। অতি শান্ত ও সহিষ্ণুতায় সে জীবনের গুরুভার বহন করে।

 

Similar Posts

Leave a Reply